মোঙ্গল সম্রাজ্যের অভ্যূত্থান - The Rise of Mongols
মোঙ্গল সম্রাজ্যের ভ্যূত্থান - (The Rise of Mongols)
লেখক:
ড. কাজী মুহাম্মদ ওমর ফারুক
সহকারী অধ্যাপক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল: +৮৮০১৭১১৪৭৫৮৮৭
omortdu@gmail.com
মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অভ্যুত্থান
প্রাক কথন:
মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অভ্যুত্থান
ভূমিকা
মধ্যযুগকে
আগেকার মত ‘অন্ধকার
যুগ’
(যার
প্রবক্তা পেত্রার্ক)
হিসেবে
আখ্যায়িত করা হয় না,
যা
দুই আলোকিত যুগ
ক্লাসিক ও রেঁনেসার মধ্যবর্তী
সময় সংগঠিত হয়েছে। প্রায়শঃ
এ সময়কে ঐতিহাসিক যুগ হিসেবে
আখ্যায়িত করা হয়। যা ৫০০ থেকে
১৫০০ সালের হাজার
বছরে মধ্যবর্তী
একটা দীর্ঘসময়কাল (ঐতিহাসিকদের
দৃষ্টিতে বিবেচ্য অন্যান্য
সময়কালের বিবেচনায়)।
মধ্যযুগের এক একটা দেশ ও অঞ্চল
ছিল আরেকটা থেকে সম্পূর্ণ
আলাদা বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ
। মূলত
আমরা যা
সময়কে “মধ্য”
যুগ বলি তা শুরু হয় রোমান
সম্রাজ্যের পতনের পর থেকে
যখন ৫ম শতকের
শেষ বা ৬ষ্ঠ
শতকের দিকে শরুর
দিকে উত্তর
ইউরোপের বার্বার গোত্রগুলির
আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যায়
এবং তা ১৫শ বা ১৬শ শতাব্দীর
দিকে ইতালি বা ইংল্যন্ডে
রেনেসাঁর পর্যন্ত বা ক্লাসিক
যুগের শুরু হওয়া সময়কাল পর্যন্ত
বিস্তৃত ছিল। তাহলে কিভাবে
এ সময়কে “মধ্য”বা
অন্ধকার যুগ বলা হয় এটা পাঠকদের
জন্য একটা দূর্ভেদ্য
বিষয় বটে।
তবে
মধ্যযুগে
এমন সময়ের নাম যাতে বেশ কতগুলো
ঘটনার সমাবেশ ঘটেছিল যা,
আধূনিক
কালের সাংস্কৃতিক উন্নতি ও
অগ্রগতিতে ব্যাপক ধারাবাহিক
ভূমিকা রেখেছে। অন্যান্য
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর মধ্যে
বিশেষভাবে উল্লেযোগ্য ঘটনা
হলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ
সা.
এর
জন্ম
(৫৭০-৬৩২
সাল)।
৭ম শতাব্দীতে খ্রীষ্ট্র ধমের্র
পতনের যুগে তার প্রচারিত ইসলাম
ধর্ম বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন
করে। ফলে একাদশ এবং দ্বাদশ
শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও
পাশ্চাত্যে ক্ষমতার দ্বন্ধ।
মধ্যযুগেই পশ্চিম ইউরোপে
আধুনিক জাতীয়তাবাদ ও আইন
শাস্ত্রের ভিত্তি রচিত হয়,
এ
সময়েই রোমান্টিক ভালোবাসার
জন্ম হয়। ২য় ঘটনাটি ছিল ক্রুসেডের
পরোক্ষ ফল। জাতীয় পরিচয়ের পথ
ধরে আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধ ব্যবস্থার উদ্ভব
হয়,
ফলে
সামরিক শক্তির উৎস হিসেবে
দূর্গ ব্যবস্থাপনার রীতি
অনুসৃত হয়। এশিয়া
অঞ্চলে
চেঙ্গিস খানের আবির্ভাব ও
আক্রমণের ফলে পূর্ব ও দক্ষিণ
ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক
আকার পরিবর্তিত হয়ে যায়।
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দশক ও এয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভিককালে মধ্য-এশিয়ার দুর্ধর্ষ মোঙ্গল
No invasion in historical times can compare in its accumulated horrors or in its far reaching consequences with that of the Mongols, which swept across the entire width of Asia annihilating populations and civilizations and from which Eastern Europe did not escape.
কিন্তু
ইহা
ঘটনার
কেবল
একটি
দিক
মাত্র।
মোঙ্গল
ইতিহাসে
ধ্বংসের
উম্মত্ত
উল্লাসের
সঙ্গে
সৃষ্টির
নব
চেতনাও
বিশেষভাবে
লক্ষণীয়।
চেঙ্গিস
খানের
পরবর্তী
বংশধরগণ
ইসলামের
তথা
বিশ্বের
ইতিহাসে
যে
সকল
কল্যাণমুখী
ও
গঠনধর্মী
অবদান
রাখিয়া
গিয়াছেন
তা
ও
প্রণিধানযোগ্য।
উৎপিত্ত:
সাধারণত
পূর্ব ও পশ্চিম মোঙ্গলিয়াতে
বসবাসকারীরা মোঙ্গল নামে
পরিচিত। বৃহৎভাবে বুঝতে হলে
মোঙ্গলিয়ান ভাষায়
যারা কথা বলত তারাই মোঙ্গল
নামে পরিচিত,
যেমনটি
পূর্ব ইউরোপের ‘কালমিক’
সম্প্রদায়। সর্বপ্রথম ৮ম
শতাব্দীর দিকে চীনা তাং বংশের
ঐতিহাসিক বিবরণীতে মোঙ্গল
শব্দটির অস্তিত্ব পরিদৃষ্ট
হয়। এ সময় তারা ‘সি-উই-ই’(Shiwei)
গোত্রের
অধীনস্ত ছিলো। তবে খিতানের
শাসনামলে ১১শ শতাব্দীর কাছাকাছি
সময়ে তারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
আসতে সক্ষম হয়। ১১২৫ সালে
‘লিয়াউ’ বংশের পতনের পর
মোঙ্গলরা শাসন ক্ষমতাসীন হয়
এবং উত্তর চীনের শাসন ব্যবস্থায়
অধিষ্ঠিত হয়। যদিও ঝিন ও তাতার
বংশের সাথে চলমান বিভিন্ন
যুদ্ধে মোঙ্গলরা বেশ দূর্বল
হয়ে পড়ে। তবে ১৩শ শতাব্দীতে
মোঙ্গল শব্দটি একটি বিস্তৃত
বিষয়কে বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত
হতে থাকে যা বৃহৎ মোঙ্গল
জনগোষ্ঠি এবং অর্ধ-তুর্ক
গোত্রগুলোকে অর্ন্তভূক্ত
করে,
যার
নেতৃত্বে ছিলেন চেংঙ্গিস
খান।iv
চৈনিক ঐতিহাসিকদের মতে,
মোঙ্গলদের
উৎপত্তি হচ্ছে পূর্ব মোঙ্গলিয়া
ও মানছুরিয়াতে শাসন প্রতিষ্ঠাকারী
যাযাবর ডংগহুv
(Donghu)
জনগোষ্টি
থেকে,
যারা
খৃষ্টপূর্ব ৭ম শতকে এ অঞ্চলে
শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং
খৃষ্টপূর্ব ১৫০ অব্দের দিকে
মধুচানউ বংশের জিয়ংগু কর্তৃক
ধ্বংশ প্রাপ্ত হয়। ডংগহু
পরবর্তীতে দুটি অংশে বিভক্ত
হয়,
যথা
উত্তরের দিকে ইউহুয়ান (Wuhuan)
এবং
দক্ষিণাঞ্চলের দিকে জিয়ানবেই
(Xianbei)।
শেষোক্ত অংশ থেকেই মোঙ্গলদের
উৎপত্তি হয়।
পরিচয়:
দূর্বোধ্য
ও অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে
মোঙ্গলদের উত্থান হলেও কালক্রমে
মোঙ্গল শব্দটি ক্ষমতা ও ভৌগলিক
দিক দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ
অবস্থানে উপনীত হয়। পূর্বে
এ শব্দটির মাধ্যমে তিনটি
বিষয়কে বুঝানো হত। প্রথমত:
গোবী
মরুভূমির দক্ষিণে বসবাসরত
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যাযাবর
শ্রেণীকে,
দ্বিতীয়ত:
এশিয়া
ও ইউরোপের কিছু নিদ্দিষ্ট
শ্রেণীর মানুষকে এবং তৃতীয়ত:
বিশ্বব্যাপী
এক বিশাল জনগোষ্ঠি এ সংজ্ঞার
আওতাভূক্ত। আর শেষোক্ত অর্থে
সকল হলুদাভার চামড়া বিশিষ্ট
জনগোষ্ঠি যারা ধূসর-লালচে,
খাড়া
চুল,
কালো
ও গাঢ় টানা টানা চোখ বিশিষ্ট
লোককে বুঝায়। এ অর্থে মোঙ্গল
শব্দটি বিশ্বের এক বিশাল
জনগোষ্ঠীকে অনর্ন্তভূক্ত
করে যারা লক্ষণ এ গঠনে প্রায়
একই রকম যেমন চাইনিজ,
কোরিয়ান,
জাপানীজ,
ম্যানসুইজ,
মূল
মোঙ্গল এবং তাদের নিকটবর্তী
তাতার বা তুর্কী গোত্রসমূহ
যারা মধ্য এশিয়া শাসন করেছিল
তারা,
চীনের
পশ্চিমে তিব্বতীসহ সকল অনার্য
এবং ইন্ডিয়া ও পারস্যে এবং
ভারতের গৌরবময় মোঘল শাসন
ব্যবস্থার উৎসও মোঙ্গলরাই।vi
দিয়ে
প্রাক্-ঐতিহাসিক
যুগ হতে মধ্য-এশিয়ায়
বিস্তীর্ণ মরু ও পার্বত্য
চারণভূমিতে বিভিন্ন যাযাবর
জাতির বসবাস
ছিল।
মোঙ্গলগণও এসব
জাতিগুলোর
মধ্যে অন্যতম একটি জাতি।
মোঙ্গলদের আদি বাসস্থান হচ্ছে
গোবি মরুভূমি উত্তরে এবং বৈকাল
হ্রদের দক্ষিণে অবস্থিত
চীনের পশ্চিম উত্তর-পশ্চিমে
মোঙ্গলিয়া নামক যেভূখণ্ড
রয়েছে এবং যার আধিকাংশই
পাবত্যাঞ্চল ও মরুভূমিতে
পূর্ণ,
সে
স্থানে।
বর্তমান সময়ে যা আধুনিক
মঙ্গোলিয়া,
চীন
ও রাশিয়ার
ভূখেণ্ড
অবস্থিত। মোঙ্গলদের
উৎপত্তি সম্মন্ধে ঐতিহাসিক
ও নৃত্ত্ববিদগণের মধ্যে মতভেদ
রয়েছে।
অনেকের মতে মোঙ্গলিয়াতে
আদি বাসস্থান হওয়ায়
এদেরকে
মোঙ্গল বলা হয়। চীনা ঐতিহাসিকগণ
মনে করেন যে,
মোঙ্গল
নামটি
চীনা ভাষার ‘মঙ্গ’
(অর্থাৎ
সাহসী)
শব্দের
পরবর্তিত রূপ। অবশ্য
পি.
সাইকেসর
মতে
মোঙ্গলরা যে হুন জাতির সাক্ষাৎ
বংশধর এ বিষয়ে প্রায় সকলে
ঐতিহাসিকই
নিশ্চিত অভিমত প্রকাশ করেছেন।vii
মাওলানা
আবুল কালাম আজাদ তাঁর আসহাবে
কাহাফ গ্রন্থে উল্লেখ করেন
যে,
মোঙ্গলদের
প্রাচীনতম নাম ছিল গগ ও মেগগ,
যাদেরকে
হযরত ঈসা আ:
এর
জন্মের পূর্বে গ্রীকগণ মেগ
ও মেগাগ নামে অভিহিত করত।
হিব্রু ও ইব্রানী ভাষায় এদেরকে
বলা হয় মাজুজ। ইউয়াচী নামক
আরেকটি জাতিকে হিব্রু ভাষায়
বলা হয় ইয়াজুজ।
মোঙ্গলদিগকে
অনেক সময় তাতার নামে অভিহিত
করা হয়ে থাকে। বস্তুত মোঙ্গলদের
প্রাচীন নাম ছিল তাতার। মধ্যে
এশিয়ার এ বিষয় যাযাবর মানব
গোষ্টীর
মধ্যে মোঙ্গলদের ন্যায় তাতার
নামেও অপর একটি পৃথক গোত্র
প্রতিষ্ঠান লাভ করে। এ তাতার
গোত্র
দীর্ঘদিন
ধরিয়া মোঙ্গলদের সাথে তীব্র
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত
ছিল। কিন্তু কালক্রমে মোঙ্গল
ও তাতারগণ
একটি অভিন্ন জাতি হিসাবে
পরিগনিত হয়ে আসতেছে। মোঙ্গল
জাতিকে
বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত করা
যায়,যথাঃ
নাইমান,মেরকাইট,কেরাইট,এবং
ঐরাইট।
নাইমান:
নাইমানরা তুর্কী নাইমানমেরকাইট:
মেরকাইট বা মেরগাইটরা হচ্ছে দ্বাদশ শতাব্দীর মঙ্গোলিয়ান ভূভাগের পাঁচটি প্রধান উপজাতীয় গোত্রীয় সংঘের অন্যতম একটি। এরা মূলত: ‘সেলেঙ্গে’ ও ‘ওরখুন’ নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাস করত। প্রায়: দু’দশক যাবত মোঙ্গলদের সাথে লড়াই করার পর ১২০০ সালের দিকে পরাজিত হয়ে তারা চেঙ্গিস খানের অধীনস্ত মোঙ্গল সম্রাজ্যের সাথে বিলিন হয়ে যায়। মেরকাইটরা প্রধানত তিনটি গোত্রে বিভক্ত ছিল, ক. উদুঈদ মেরকাইট: এরা ‘ওরখুন’ নদীর নিম্নাঞ্চলে ‘বুররে খীর’ নামক স্থানে বসবাস করত। খ. উভাস মেরকাইট: এরা ‘ওরখুন’ ও ‘সেলেঙ্গে’ নদীর মধ্যবর্তী ‘টার’ নামক স্থানে বাস করত। গ. খাদ মেরকাইট: এরা সেলেঙ্গে নদীর নিকটবর্তী ‘খারাজী খীর’ নামক স্থানে বাস করত।
তেমুজীনের
মাতা হেলুন ছিলেন ‘ওলখুনেট’
গোত্রীয় নারী। মেরকাইট গোত্রের
নেতা ‘ইয়াহি ছিলেদু’ এর সাথে
১১৫৩ সালে হেলুনের বিয়ে হয়,
কিন্তু
তেমুজীনের পিতা ইচুজাই কর্তৃক
তিনি ‘ইয়াহি ছিলেদু’ এর বাড়ী
থেকে অপহৃত হন। প্রতিশোধ
স্বরুপ তেমুচীনের স্ত্রী
বোরতে ১১৮১ সালে মেরকাইট
গোত্রের লোকদের কর্তৃক ওনোন
নদীর নিকটবর্তী স্থান থেকে
অপহৃত হন। তেমুচীন একই বছর
তার রক্ত সম্পর্কীয় ভাই জামুকা,
সৎ
ভাই তুঘ্রিল ও কেরাইট খান এর
সহয়তায় তার স্ত্রীকে উদ্ধার
করতে সক্ষম হন। স্ত্রীকে
উদ্ধারের অল্প সময় পরেই বোরতে
একটি পুত্র সন্তানের জন্ম
দেন যার নাম রাখা হয় জুচী।
তেমুচীন তাকে পুত্র হিসেবে
গ্রহণ করেন,
কিন্তু
জুচীর পরবর্তী জীবন ইতিহাসের
দিকে তাকালে দেখা যায় এটি তার
জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
এসব ঘটনাবলী মেরকাইটদের সাথে
তেমুচীনের পারিবারিক সম্পর্ককে
তিক্ত করেআসে। পরবর্তী দু’দশক
কাল চেঙ্গিসখান মেরকাইটদের
বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালনা
করেন। ১২০৬ সালে তেমুচীন সকল
মোঙ্গলদের একত্রিত করে ‘চেঙ্গিস
খান’ উপাধি গ্রহণ করলে মেরকাইটদের
একটি আলাদা গোত্র হিসেবে বেঁচে
থাকার স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে
যায়। তাদের অনেকেই ঐরাইট ও
কিপচাকদের সাথে মিশে যায়।
১২১৫-১৮
সালের মধ্যে তারা জুচী ও
সুবোতাইয়ের হাতে সম্পূর্ণরুপে
বিধ্বস্ত হয়। ‘খুলান’ নামে
চেঙ্গিস খানের একজন মেরকাইট
স্ত্রী ছিল। কুয়ুক খানের
স্ত্রী ‘ওগোল গামিস’ ছিলেন
এ গোত্ররই একজন প্রভাবশালী
নারী।
কেরাইট:
কেরাইটরাও ছিল মেরকাইট গোত্রের মত দ্বাদশ শতাব্দীর মঙ্গোলিয়ান ভূভাগের পাঁচটি প্রধান উপজাতীয় গোত্রী, সংঘের অন্যতম একটি প্রধান গোত্র যেটি অন্যান্য গোত্র সমূহের উপর প্রভাব বিস্তার করত। মোঙ্গল শাসন প্রতাষ্ঠায় অন্যতম সাহায্যকারী গোত্র হিসেবে যারা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ১১শতকে তারা নেস্টোরিয়ান খ্রীস্টানধম মতে দীক্ষিত হয় এবং মোঙ্গলদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খ্রীস্টান মতাদশী গোত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তারা ‘খানগেই’ ও ‘খেনতেঈ’ পর্বতমালার মধ্যবর্তী আধুনিক উলান বাটরের নিকটে বসবাস করত। সবশেষ কেরাইট নেতা তুঘরুল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ইউরোপো খ্যাতি অর্জন করেন। অনেক কেরাইট রমনী মোঙ্গল রাজ দরবারে বিশেষ প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হন। তুঘরুলের ভ্রাতা জাখা খাম্বুলের কন্যা ‘শোরেখতেতানী বেইকি’ চেঙ্গিস খানের ছোট সন্তান তুলীকে বিয়ে করেন এবং তার গর্ভজাত চারজন সন্তানকে মোঙ্গলদের মহান খানের আসনে সমাসীন করাতে সক্ষম হন, এরা হলেন মোঙ্গকে খান, হালাকু খান, আরিক বুকে ও কুবলাই খান। ‘শোরেখতেতানী বেইকি’ শুধুমাত্র মোঙ্গল শাসনেই নয় বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী নারী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন।xঐরাইট:
ঐরাইটবিস্তৃতি:
মোঙ্গল
শাসনের বিস্তৃতির সাথে সাথে
এটি প্রায় সমগ্র ইউরেশিয়াতে
আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম
হয় এবং আড্রিয়াটিক সাগর থেকে
জাভা পর্যন্ত এবং জাপান থেকে
প্যালেস্টাইন পর্যন্ত সামরিক
অভিযান প্রেরণ করে। একই সময়ে
মোঙ্গলরা পারস্যের বাদশাহ,
চীনের
রাজা এবং মোঙ্গলিয়ার মহান
খান এমনকি একজন মোঙ্গল ব্যাক্তি
(আল
আদিল কিৎবুঘা)
মিশরের
সুলতান হওয়ার গৌরব লাভ করে।
গোল্ডেন হোর্ডের মোঙ্গলরা
১২৪০ সালে নিজেদেরকে রাশিয়ার
শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে
এবং ১২৭৯ সালের মধ্যে মোঙ্গলরা
চীনের সাঙ্গ শাসনের পতন ঘটিয়ে
মোঙ্গল ইউয়ান বংশের শাসনের
সুত্রপাত করে।মোঙ্গল শাসন
ব্যবস্থার পতনের যুগে মোঙ্গলদের
অনেকেই তাদের চারপাশ্বের
তার্কিক সংস্কৃতি গ্রহণ করে
এবং তাদের সাথে মিশে যায়।
এভাবে তারা তাতার (প্রাচীন
মোঙ্গল তাতার গোত্র নয়),
উজবেক,
কাজাক,
ইউগুরxii
ও মোঘল শাসনের উদ্ভব ঘটায়
যাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতি
ও সংস্কৃতি ছিল এবং এ সকল অঞ্চলে
খ্যাতি অর্জন করে।
যা
হোক অধিকাংশ মোঙ্গলরাই
মঙ্গোলিয়াতে ফিরে আসে এবং
তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি গ্রহণ
করে। ১৩৬৮ সালে ইউয়ান শাসনের
পতনের পর মোঙ্গলরা দক্ষিণ
ইউয়ানে তাদের স্বাধীন শাসন
শুরু করে। কিন্ত দেখা যায় যে,
এ
সময় ১৪শ শতাব্দীর শেষের দিকে
ওরাইড বা পশ্চিমের মোঙ্গলরা
বরজিগিন শাসকদের নেতৃত্বে
পূর্বের মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে
অভিযান পরিচালনা করতে শুরু
করে। বতর্মান সময়ে বিদ্যমান
খালখা (Khalkha)
মোঙ্গল
এবং ইনার মোঙ্গলরা হেচ্ছে
পূর্বাঞ্চলীয় মোঙ্গলদের শেষ
বংশধর আর অন্যদিকে কালমিক
(Kalmyks)
মোঙ্গলরা(সাবেক
ঔরাইড)
হচ্ছে
পশ্চিমাঞ্চলীয় মোঙ্গলদের
সাক্ষাত বংশধর। খালখারা দায়ান
খানের (১৪৬৪-১৫৪৩)
শাসনামলে
পূর্বাঞ্চলীয় মোঙ্গলদের ছয়
তুমেনের অন্যতম তুমেন হিসেবে
খ্যাতি লাভ করে। বর্হি মঙ্গোলিয়াতে
তারা দ্রুত প্রভাব বিস্তারকারী
মোঙ্গল গোত্রের আসেন অভিষিক্ত
হয়।xiii
শ্রেণী বিভাগ:
সভ্যতার
তারতম্য হিসাবে চীনা ঐতিহাসিকগণ
অবশ্য মোঙ্গলদিগকে তাতার
হিসেবে সাব্যস্ত করে তিনটি
শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন,যথাঃ
শ্বেত তাতার,
কৃষ্ণ
তাতার ও বন্য তাতার।xiv
জীবন যাত্রা:
মোঙ্গলদের
জীবন যাত্রা প্রণালী ছিল
অত্যন্ত সহজ ও সরল। তারা
অন্যান্য যাযাবর জাতির ন্যায়
তাঁবুতে বসবাস করিত এবং পশুর
চামড়া ছিল তাদের অন্যতম প্রধান
পরিধেয়। মেষ চারণ,
পশু
শিকার ও লুটতরাজ করেই তা রা
জীবিকা নির্বাহ করিত। দুগ্ধ
ও মাংস ছিল তাদেরঅন্যতম প্রধান
খাদ্য। তাদের অনেক খ্রিষ্টান
ধর্মের সামানীয় এবং অনেকে
নেস্টোরীয় শাখার অনুসারী
ছিল। মোঙ্গলদের ধর্মীয় বিশ্বাস
ও আহার্য দ্রব্যাদি প্রসঙ্গে
প্রসিদ্ধ
ঐতিহাসিক
ইবনুল আসির বলেন,
“As for their religion, they
worshipped the sun when it rises, and regard nothing as unlawful, for
they eat all beasts, even dogs, pigs and the like; nor do they
recognize the marriage-tie, for several men are in marital relations
with one women and if a child is born, it knows not who is its
father.” xv
অথ্যাৎ
“প্রাতঃকালীন
উদীয়মান সূর্যের পূজা করা
ছিল তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস।
বৈধ অবৈধের কোন ধারাই তা রা
ধারিত না। নির্বিচারে তা রা
সকল প্রাণীর মাংস ভক্ষণ
করিত;এমনকি
কুকুর ,শূকর
ও অনুরূপ প্রাণীও বাদ দিত না।
বৈবাহিক সম্পর্ককে তারা
স্বীকৃতি দিত না। একাধিক
ব্যাক্তি একজন নারীকে বিয়ে
করত;ফলে
কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করলে
তার পিতার পরিচয় জানা যেতনা,
অসভ্য
যাযাবর জীবনের প্রায় সকল
দোষ-গুণই
মোঙ্গলদের চরিত্রে পরিলক্ষিত
হয়।সাহসিকতা কষ্টসহিষ্ণুতা
ও দলপতির প্রতি অকৃত্রিম
আনুগত্য ছিল তাদের চারিত্রিক
বৈশিষ্ট্য। ইহা ছাড়া দুর্ধর্ষ
যোদ্ধা,সুপটু
অশ্বরোহী ও তীরন্দাজ। হিসাবে
ও তাদের বিশেষ সুখ্যাতি ছিল।
বলা বাহুল্য যে,ভৌগলিক
পরিবেশই তাদের
চরিত্রের
এ সকল দোষ-
গুণের
জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল।
মোঙ্গলদের প্রাচীন ইতিহাস
সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা
যায় না। দ্বাদশ শতকের প্রারম্ভে
মোঙ্গলরা উত্তর-চীনের
কিন সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে
পড়ে। চেঙ্গিস খানের প্রপিতামহ
কাবুল খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা
১১৩৮ -৩৯
খ্রিস্টাব্দে কিন সাম্রজ্যের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে
এবং কিন সেনাপতি কুসাকু তাদের
নিকট
পরাজিত হন। কাবুল খান নামক
এক ব্যক্তি এ সময় বিশেষ শক্তিশালী
হয়ে উঠেন এবং ‘খাকন’
উপাধি ধারণ করেন।xvi
কাবুল খানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা
লাভের আশায় পরাধীনতার বেড়াজাল
ছিন্ন করে পরাধীনতার এ প্রথম
সাফল্যজনক বিদ্রোহ অদূর
ভবিষ্যতে
মোঙ্গলদের মধ্যে বিশেষ জাতীয়
চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটাতে
সাহায্য করে। অতঃপর ত্রয়োদশ
শতকের প্রথম দিকে বিভিন্ন
গোত্র বিভক্ত ও সদা আত্মকহলে
লিপ্ত মোঙ্গল জাতি চেঙ্গিস
খানের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী
আজয় মহাজাতিরুপে আত্ম প্রকাশ
করে।
নোট এণ্ড রেফারেন্সেসঃ
viii.
Gibbon,
Edward (1920), The
History of the Decline and Fall of the Roman Empire,
Methuen
Publishing,http://books.google.com/books,
Retrieved 2008-03-16.
ix.
Czaplicka,
Marie Antoinette (2001). The
Turks of Central Asia in History and at the Present Day,
Adamant Media Corporation, http://books.google.com/books,
Retrieved 2008-03-16.
x.
Jack
Weatherford (2004), Genghis
Khan and the making of the modern world (long excerpts).
Three Rivers Press. ISBN 978-0-609-61062-6
(0-609-61062-7).
xii.
ইউগুর
(Wighur)
হলো
মধ্য এশিয়ার তুর্কি গোত্র।
যারা তাদের আইনসমূহ সিরিয়ার
খ্রীস্টান ও ম্যানিসিয়ানদের
থেকে পেয়েছিল। এটা উচ্চ থেকে
নিম্নগামী ইউগুর বর্ণমালায়
লিখিত। ইসলাম গ্রহণ করে বর্তমান
ইউগুর মুসলিম সমপ্রদায় খুবই
অমানবিক কষ্ট ভোগ করছে। চীনের
জিনজিয়াং প্রদেশে এদের বসবাস।
চীনা সরকার এ মুসলিম সমপ্রদায়ের
নূন্যতম মৌলিক মানবাধিকারও
পূরণ করছে না। ইউগুরদের বর্তমান
নেতা (২০১১)
হলেন
আমেরিকায় নির্বাসিত মিসেস
রাবেয়া কাদের।
xiii.
Jerry
Bentley, “Old
World Encounters: Cross-Cultural Contacts and Exchange in Pre-Modern
Times,
New York: Oxford University Press, 1993, 136.
xiv.
( White tartars, Black
Tatrtars, Wild Tartars) Bertold
Spuar, The Muslim
World Mongol Age,
Tran. from German
by F. R. C. Bagley, Vol. II, Netherland, 1960, P. 2.
No comments